মোহাম্মদ বিন সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সউদ সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স, দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন (২০১৫-২০২২। প্রিন্স মোহাম্মদ রয়েল কোর্ট হাউজ অব সৌদির প্রধান এবং কাউন্সিল ফর ইকোনমিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যাফেয়ার্সের চেয়ারম্যান। ২০১৭ সালের জুনে তিনি সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স নিযুক্ত হন।
প্রাথমিক জীবন : মোহাম্মদ বিন সালমান বিন আল সউদ ১৯৮৫ সালের ৩১ আগস্ট জেদ্দায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাদশাহ সালমানের তৃতীয় স্ত্রী ফাহদা বিনতে ফালাহ বিন সুলতান বিন হাতলিনের সন্তান। প্রিন্স মোহাম্মদ কিং সউদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনশাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।
ক্যারিয়ার : বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জনের পর প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান তার বাবার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করার আগে কয়েক বছর বেসরকারি খাতের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। সৌদি মন্ত্রিসভার জন্য দায়িত্ব পালনকারী বিশেষজ্ঞ কমিশনের পরামর্শক হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন।
২০০৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর বাবা সালমান রিয়াদের গভর্নর থাকাকালে মোহাম্মদ বিন সালমান তার বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দিয়ে রাজনৈতিক অভিযাত্রা শুরু করেন। এ সময় প্রিন্স সালমান বিভিন্ন পদবি পেতে শুরু করেন। রিয়াদ কম্পিটিটিভ কাউন্সিলের সেক্রেটারি জেনারেল, কিং আবদুুল আজিজ ফাউন্ডেশন ফর রিসার্চ অ্যান্ড আর্কাইভসের বোর্ড চেয়ারম্যান, রিয়াদ অঞ্চলের আলবির সোসাইটির বোর্ড অব ট্রাস্টির সদস্য পদ এর মধ্যে অন্যতম।
কোর্টের প্রধান : ২০১২ সালের জুন মাসে ক্রাউন প্রিন্স নায়েফ বিন আবদুল আজিজ মৃত্যুবরণ করেন। এর পর প্রিন্স সালমান সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে দ্বিতীয় স্থানে উন্নীত হন। তিনি এ সময় তার পিতা ক্রাউন প্রিন্স ও প্রথম উপ-প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। এতে তিনি নিজের প্রভাব প্রতিষ্ঠার মতো করে কোর্টে বিন্যাস আনেন। ২০১৩ সালের ২ মার্চ হাউস প্রিন্স কোর্টের প্রধান প্রিন্স সউদ বিন নায়েফ ইস্টার্ন প্রভিন্সের গভর্নর নিযুক্ত হলে মোহাম্মদ বিন সালমান ওই পদে নিযুক্তি লাভ করেন। এ সময় তাকে মন্ত্রীর পদমর্যাদাও দেয়া হয়। ২০১৪ সালের ২৫ এপ্রিল প্রিন্স মোহাম্মদ প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত হন।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স : ২০১৫ সালের ২৩ জানুয়ারি বাদশাহ আবদুুল্লাহ বিন আবদুুল আজিজ ইন্তেকাল করলে সালমান বিন আবদুুল আজিজ সৌদি আরবের বাদশাহ নিযুক্ত হন। আর তখন বাদশাহ সালমান প্রিন্স মোহাম্মদকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। একই দিন রয়েল কোর্টের সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবেও তার নাম ঘোষণা করা হয়। একই সাথে তার প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর পদমর্যাদাও অব্যাহত থাকে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তার সময়ে সবচেয়ে বড় ঘটনা ছিল ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের দমনে ইয়েমেনে যৌথ অভিযান। তিনি হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে দ্রুত জয় লাভ এবং আবদ রাব্বু মনসুর হাদিকে আবার ক্ষমতায় বসানোর জন্য যুদ্ধে লিপ্ত হন। ফলে এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপ নেয়।
ক্রাউন প্রিন্স : ২০১৭ সালের ২১ জুন প্রিন্স মোহাম্মদদ বিন সালমান ক্রাউন প্রিন্স নিযুক্ত হন। তার পিতা মোহাম্মদ বিন নায়েফকে পদচ্যুত করার পর সিংহাসনের উত্তরাধিকারী করতে তাকে এই নিযুক্তি দেন।
প্রধানমন্ত্রী : বাদশাহ সালমান ২০২২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানকে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার : ২০১৫ সালের ২৯ জানুয়ারি প্রিন্স মুহাম্মদ বিন সালমানকে ভেঙে দেয়া সুপ্রিম ইকোনমিক কমিশনের বদলে নতুন প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক এবং উন্নয়ন বিষয়ক পরিষদের (কাউন্সিল ফর ইকোনমিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যাফেয়ার্স) চেয়ার (সভাপতি) ঘোষণা করা হয়েছে। ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে নিযুক্তির ৪৮ ঘণ্টা পর রাজকীয় ঘোষণার মাধ্যমে প্রিন্স সালমানকে সৌদি আরামকোর নিয়ন্ত্রণ দেয়া হয়েছে।
২০১৫-২০১৬ সালে প্রিন্স সালমানের উদ্বেগ ছিল সৌদির অর্থনীতিকে আরো বহুমুখীকরণ এবং বেসরকারি সংস্কারের প্রতি। তার সংস্কারের পরিকল্পনাটি ছিল ‘ভিশন ২০৩০’ যেখানে তেলবহির্ভূত রাজস্ব এবং বেসরকারীকরণ থেকে ই-গভর্নমেন্ট এবং টেকসই উন্নয়নের বিস্তারিত লক্ষ্যমাত্রা তুলে ধরা হয়েছে। আল আরাবিয়ার সাথে এক সাক্ষাৎকারে অ-সৌদি বিদেশীদের জন্য ‘গ্রিন কার্ড’ দেয়ার কথা তিনি তুলে ধরেন।
প্রিন্স মুহাম্মদ বিন সালমানের সবচেয়ে বড় বাজি ধরা পরিকল্পনাটি ছিল বৈশ্বিক তেলের বাজারে নতুন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সৌদির তেল দীর্ঘদিন স্বল্পমূল্যে ধরে রেখে দেউলিয়াত্ব থেকে সৌদি রাজকীয় সরকারের আধিপত্য পুনরুদ্ধার করা। সৌদি আরব ওপেককে একই রকমের কাজ করতে রাজি করাতে পেরেছিল।
সিঙ্গাপুরের নানিয়াং টেকনোলজি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার সিনিয়র ফেলো জেমস ডারসি বলেছিলেন, সৌদি আরবে বিন সালমান রাজ্যের যুবসমাজের সাথে সংযোগ স্থাপনের ক্ষমতাসহ এমন অনেক ধরনের সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন, যাতে তিনি যা পারেন বিশেষত সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ক্ষেত্রে প্রত্যাশা পূরণ করার মূল বিষয়ে; তা সেভাবে প্রবীণ প্রজন্ম পারে না।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্কার
ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে পদমর্যাদা পাওয়ার পর রাজ্যে তিনি কিছু সফল সংস্কারের নেতৃত্ব দেন। এগুলোর মধ্যে আছে ২০১৮ সালের জুনে নারী গাড়ি ড্রাইভিং নিষিদ্ধের আইন তুলে দেয়া এবং ২০১৯ সালের আগস্টে নারীদের জন্য পুরুষ অভিভাবকত্বের পদ্ধতি প্রত্যাহার করা। তার শাসনামলে অন্য আরেকটি সাংস্কৃতিক উন্নয়ন হলো, নারীদের জন্য প্রথমবারের মতো খেলাধুলার অনুমোদন দিয়ে স্টেডিয়াম তৈরি করে দেয়া, কর্মক্ষেত্রে নারীদের অধিকতর উপস্থিতি, ই-ভিসা পদ্ধতির মাধ্যমে দেশকে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে পরিচয় করিয়ে দিতে উন্মুক্ত করে দেয়া, ডিজিটাল প্লাটফর্মের মাধ্যমে বিদেশীদের ভিসা আবেদন অনুমোদন করা। ভিশন ২০৩০ কর্মসূচির লক্ষ্য হলো, প্রযুক্তি ও পর্যটনসহ তেলবহির্ভূত সেক্টরে বিনিয়োগের মাধ্যমে সৌদির অর্থনীতি বহুমুখীকরণ।
মানব কল্যাণ
মোহাম্মদ বিন সালমান যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করে নিজে এর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। এই প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য হলো- সুবিধাবঞ্চিত যুবকদের সহায়তা করা। ফাউন্ডেশনটি ২০১৩ সালে নবম ইউনেস্কো যুব ফোরামের অংশীদার ছিল। ফাউন্ডেশনটি কাজ করে দেশের যুবকদের ওপর দৃষ্টি রেখে। কলা ও বিজ্ঞানের বিকাশের মতো অনুকূল পরিবেশে প্রতিভা, সৃজনশীলতা এবং নানাবিধ আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের জন্য বিভিন্ন উপায়-উপকরণ সরবরাহ করে প্রতিষ্ঠানটি। ফাউন্ডেশন স্থানীয় এবং বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বিত কর্মসূচি তৈরি করে এবং অংশীদার হয়ে এই লক্ষ্যগুলো অর্জনের চেষ্টা করে। এটি যুবকদের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা বিকাশের পাশাপাশি সৌদি নাগরিকের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্যও বিশেষ প্রচেষ্টা গ্রহণ করে।