পরিবারের ভাষ্য, রাজিয়া সুলতানার প্রসববেদনা উঠেছিল ১৩ মার্চ বেলা তিনটার দিকে। রাত সাড়ে ১০টায় সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়। সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল রাজিয়াকে মৃত ঘোষণা করে রাত তিনটার দিকে। ১২ ঘণ্টার মধ্যে সব শেষ।
রাজিয়ার মৃত্যুর কারণ কী? সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগে-পরে আঁতুড়ঘরে উপস্থিত ছিলেন রাজিয়ার মা আবিরন বেগম। আগেই বলেছি আবিরন জন (দিনমজুরি) খাটেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত নন। তাঁর কাছে জানতে চাই, মেয়ের অবস্থা যে এত খারাপ, বোঝেননি? জবাবে তিনি বলেন, ‘বাচ্চা বাইর হয়ে এসেছে, ফুল পইড়ে গেছে, তা আর কী চিন্তা! এই দুটো নিয়েই তো যত দুশ্চিন্তা।’
রাজিয়ার স্বামী ইয়াম রহমান সন্তান ভূমিষ্ঠের সময় স্ত্রীর পাশে ছিলেন না। মৃত্যুর পর শিশুটিকে নিয়ে গেছেন। এর আগে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, স্ত্রীর সন্তান হবে বলে তিনি আগেই টাকা পাঠিয়ে রেখেছিলেন। ছুটি পাননি বলে আসতে পারেননি। রাজিয়ার মৃত্যুর জন্য তাঁর শ্বশুরবাড়ির লোকজন দায়ী।
রাজিয়ার পরিবারের কাছ থেকে গর্ভাবস্থায় করা দুটি আলট্রাসাউন্ড রিপোর্ট, আর একটি টিকার কার্ড ছাড়া কিছু পাওয়া যায়নি। এই সম্বল করে ২০ মার্চ সহকর্মী কল্যাণ ব্যানার্জীকে নিয়ে এবার আমাদের গন্তব্য সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ। কলেজের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের প্রধান শংকর প্রসাদ বিশ্বাস শুরুতেই বলেন, ‘এমন একটা বিষয় নিয়ে জানতে চাইছেন, যার কিছুই আমি জানি না। ধারণা করি, রাজিয়ার মৃত্যু হয়েছে প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণে।’ পরিবার তো বলছে, রাজিয়া সুস্থ ছিল। জবাবে তিনি বললেন, ‘মানবদেহে ৫ লিটার রক্ত থাকে। প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণে পাঁচ মিনিটে দুই লিটার রক্ত বেরিয়ে যেতে পারে। খুব দ্রুত এ সময় রোগীর অবস্থা খারাপ হয়।’
আমরা সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজের আরেকজন স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলি। রাজিয়ার দুটি আলট্রাসাউন্ড রিপোর্ট তাঁকে দেখাই। চিকিৎসক বললেন, ‘একদম ঠিক আছে। প্রথম রিপোর্টে বাচ্চা পেটের ভেতর উল্টে আছে, কিন্তু সর্বশেষ রিপোর্টে বাচ্চার পজিশন (অবস্থান) ঠিক আছে।’ তাঁরও ধারণা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে রাজিয়ার মৃত্যু হয়েছে। বাসায় সন্তান প্রসবই কি এর কারণ? চিকিৎসকের ধারণা তা-ই। তিনি বলেন, বিদেশেও বাসায় সন্তান প্রসব হয়, একেবারে যে হয় না, তা নয়। সে ক্ষেত্রে সন্তানসম্ভবা মা একজন স্বাস্থ্যকর্মীর সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে থাকেন। স্থানীয় হাসপাতালও অবহিত থাকে।