রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আগস্টে তার প্রত্যাশিত সফরের সময় দক্ষিণ আফ্রিকার পশ্চিম কেপ প্রদেশে পা রাখলে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে।

বিরোধী ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স পার্টির (ডিএ) নেতা এবং প্রদেশের প্রিমিয়ার অ্যালান উইন্ড বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘পুতিন ক্রমাগত এবং সহিংসভাবে ইউক্রেনের জনগণ এবং তার নিজের দেশে যারা তার নৃশংস কর্মের বিরুদ্ধে নীতিগত অবস্থান নেওয়ার সাহস করে তাদের স্বাধীনতা খর্ব করেছেন।’

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) গত মাসে ওয়েস্টার্ন কেপ প্রদেশে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আশা করা পুতিনের জন্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। ব্রিকস হলো উদীয়মান অর্থনীতির একটি গোষ্ঠী, যার মধ্যে রাশিয়া, ব্রাজিল, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকা রয়েছে।

প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা এই সপ্তাহের শুরুতে বলেছিলেন, তার শাসক দল আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টি (এএনসি) আইসিসি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু তার কার্যালয় অবিলম্বে এই মন্তব্য প্রত্যাহার করে বলেছিল, এটি যোগাযোগের একটি ত্রুটি এবং দক্ষিণ আফ্রিকা রোম সংবিধিতে স্বাক্ষরকারী হিসেবে থাকবে।

এদিকে উইন্ড বলেছেন, ‘এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মুখেও জাতীয় সরকার আপাতদৃষ্টিতে এই বছরের শেষের দিকে নির্ধারিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে পুতিনের সঙ্গে আগাতে এবং তাকে হোস্ট করতে চায়। এটি অগ্রহণযোগ্য ও শোচনীয়।’

উইন্ড জানান, পুতিন যদি ওয়েস্টার্ন কেপ প্রদেশে আসেন, তাহলে প্রাদেশিক সরকারের অর্থায়নে গঠিত আইন প্রয়োগকারী অ্যাডভান্সমেন্ট প্ল্যানের (এলইএপি) কর্মকর্তাদের দিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে।

তিনি বলেন, ‘যদি দক্ষিণ আফ্রিকান পুলিশকে কাজ করার নির্দেশ না দেওয়া হয়, তাহলে আমরাই করব।’

উইন্ড বলেছিলেন, তার প্রদেশ, যার মধ্যে পর্যটন শহর কেপটাউন রয়েছে, শুধু দক্ষিণ আফ্রিকানদের মৌলিক অধিকার এবং স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে না, রাশিয়ার বেসামরিক নাগরিকদের ওপর চালানো নৃশংস শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ইউক্রেনের সঙ্গে সংহতি দেখাতেও চায়।

তিনি বলেন, ‘আমি অত্যন্ত বিরক্ত হয়েছি যে কিভাবে জাতীয় সরকার দক্ষিণ আফ্রিকানদের স্বাধীনতা সুরক্ষিত করার দিকে মনোনিবেশ করার পরিবর্তে ভ্লাদিমির পুতিনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর সম্পূর্ণ মনোযোগী।’ গণতন্ত্রের ২৯ বছরেও দেশের অনেকেই ভয় থেকে মুক্ত নয় এবং এখনো অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করতে পারেনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কীভাবে পরিচালনা করা যায় সে বিষয়ে আইনি পরামর্শ নিচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার। ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে আগস্টে রুশ নেতার দক্ষিণ আফ্রিকা যাওয়ার কথা রয়েছে।

ইউক্রেন থেকে শিশুদের অপহরণের অভিযোগে যুদ্ধাপরাধের দায়ে ১৮ মার্চ পুতিনের বিরুদ্ধে আইসিসি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। আইসিসি প্রতিষ্ঠা করা রোম সংবিধিতে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকা পুতিনকে গ্রেপ্তারের আদেশ কার্যকর করতে বাধ্য হতে পারে।

শুক্রবার দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারককে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা মন্ত্রী নালেদি পান্দর বলেন, ‘আমরা এই বিষয়ে একটি নতুন আইনি মতামতের জন্য অপেক্ষা করছি। আমরা ইউক্রেনের জনগণের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। আমরা যা করতে চাই তা হলো, এমন একটি অবস্থানে পৌঁছানো, যেখানে আমরা শান্তির দিকে প্ররোচিত করতে দুই দেশের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারি।’

ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার যুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকা নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করে এসেছে। দেশটির বৃহত্তম কিছু ব্যাংক ও ব্যবসায়িক অংশীদারসহ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের অবস্থানের বিরোধিতা করেছে।

পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুই কর্মকর্তা বলেছেন, কোনো সফরকারী রাষ্ট্রপ্রধানকে দক্ষিণ আফ্রিকার গ্রেপ্তার করার সম্ভাবনা নেই। সরকার এবং ক্ষমতাসীন আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস পরোয়ানা কার্যকর করা এড়াতে সমস্ত বিকল্প বিবেচনা করছে। তবে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্ররা মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এদিকে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভের বরাত দিয়ে ইন্টারফ্যাক্স জানিয়েছে, ব্রিকস সম্মেলনের জন্য পুতিন দক্ষিণ আফ্রিকায় যাবেন কিনা সে বিষয়ে ক্রেমলিন এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

২০১৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছিল, যখন তারা সুদানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরের জন্য আইসিসি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করতে অস্বীকার করেছিল। আল-বশির তখন সেখানে আফ্রিকান ইউনিয়নের শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান করছিলেন। দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমা ২০১৬ সালে আইসিসি থেকে প্রত্যাহারের প্রস্তাবও করেছিলেন। তবে সেই পরিকল্পনাটি পরে বাদ দেওয়া হয়।

দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার আগামী সপ্তাহে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংক্রান্ত দুই দেশের যৌথ আন্তঃসরকারি কমিটির বৈঠকের আয়োজন করবে। সেখানে রাশিয়ান মন্ত্রীদের একটি প্রতিনিধিদলও যোগ দেবে।

সূত্র : আল অ্যারাবিয়া