বঙ্গবাজারের পার্শ্ববর্তী হানিফ ফ্লাইওভারের নিচে অস্থায়ীভাবে দোকান বসিয়েছেন অনেকে। প্লাস্টিকের বস্তা, চৌকি কিংবা টুল বিছিয়ে তারা পোশাক বিক্রি করছেন।এসব মালামালের অধিকাংশই বিভিন্ন কারখানায় ছিল। কিছু পোশাক আবার বঙ্গবাজারের সব মার্কেটে আগুন ছড়িয়ে যাওয়ার আগেই বের করতে পেরেছিলেন কেউ কেউ।
নতুন জামাকাপড় সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ছাইচাপা আগুন থেকে ধোঁয়া উড়ছে। ট্রাকে করে সরানো হচ্ছে পোড়াস্তূপ। ব্যবসায়ীরা করুণ চোখে তাকিয়ে সেসব দেখছেন। তাদের মধ্যে কিছু ব্যবসায়ী রাস্তাতেই ‘শেষ সম্বল’ নিয়ে বসেছেন।
ব্যবসায়ী মাছুম রানা বঙ্গবাজারের ধ্বংসস্তূপ থেকে কিছু একটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছিলেন। কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতেই জানালেন, দোকানের সব পুড়ে গেছে। কিছুই অবশিষ্ট নেই। দোকানের বাকির খাতাটি খুঁজছেন তিনি, যদি পাওয়া যায়।
যাঁরা মাছুমের কাছ থেকে বাকিতে মালামাল নিয়েছেন, তাঁদের মুঠোফোন নম্বরসহ বিস্তারিত লেখা ছিল ওই খাতায়। ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার মালামাল তিনি বাকিতে দিয়েছিলেন। খাতাটি পেলে হয়তো সেই পাওনা টাকা উদ্ধারের চেষ্টা করতে পারতেন।
মাছুম রানা যখন বাকির খাতাটি খুঁজছিলেন, তখন তাঁর হাত ধরেছিল আট বছর বয়সী মাইশা ইসলাম মাহী। ছোট্ট মাইশা বাবার সঙ্গে দোকানে আসার বায়না ধরত প্রায়ই।
গতকাল সকাল সাড়ে ৯টায় বঙ্গবাজারে অগ্নিকাণ্ডের ৭৫ ঘণ্টা পর আগুন সম্পূর্ণভাবে নির্বাপণ সম্পন্ন হয়েছে বলে ঘোষণা দেয় ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স। এরপর সকাল ১০টায় পোড়াস্তূপ সরানোর কাজ শুরু হয়। বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স দোকান মালিক সমিতি জানায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অনুমতি নিয়ে মেসার্স বুশরা ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে পোড়াস্তূপ সরানোর দায়িত্ব দেয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি দরপত্রের মাধ্যমে ৪০ লাখ টাকায় এসব পোড়াস্তূপ কিনে নিয়েছে। তারা পোড়াস্তূপ নিয়ে গেলে ডিএসসিসি জায়গাটি পরিষ্কার করে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের অস্থায়ীভাবে এখানে বসার ব্যবস্থা করে দিবে। বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স দোকান মালিক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. নাজমুল হুদা বলেন, আগুন অনেকটা নিয়ন্ত্রণে চলে আসার পর অনেকে বিচ্ছিন্নভাবে এখান থেকে মালামাল (পোশাক ও লোহা লক্কর) চুরি করে নিয়ে গেছে। প্রশাসন বা আমরা সেই নিরাপত্তা দিতে পারিনি। পরে অবশিষ্ট মালামাল আমরা যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে দরপত্রের মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে সর্বোচ্চ দরে বিক্রি করে দিয়েছি। তারা এসব মালামাল নিয়ে যাওয়ার পর সিটি করপোরেশন জায়গাটি পরিষ্কার করে দিবে। মালামাল বিক্রির টাকা ব্যবসায়ী মালিক সমিতির কাছে থাকবে। পরবর্তীতে এ টাকা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের দেয়া হবে।
গত মঙ্গলবার সকালে বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সে আগুন লাগে। সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের কয়েকটি বিপণিবিতানে। সাড়ে ছয় ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও বুধবার অ্যানেক্সকো টাওয়ারে থেমে থেমে ধোঁয়া ও আগুন জ্বলে। গতকাল বৃহস্পতিবার বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের কিছু জায়গা থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। আজ শুক্রবার সকালে আগুন পুরোপুরি নেভানো সম্ভব হয় বলে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
আজ সকালে বঙ্গবাজারে গিয়ে দেখা যায়, পুরো বঙ্গবাজার যেন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সেখানে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে। ঘটনাস্থলের আশপাশ এলাকায় ব্যবসায়ীরা বিলাপ করছিলেন। তাঁদের দাবি, ধ্বংসস্তূপ থেকে মালামাল সরিয়ে নেওয়ার পর ব্যবসায়ীদের যেন সেখানে অস্থায়ীভাবে ব্যবসা করার অনুমতি দেওয়া হয়। কারণ, সবচেয়ে বেশি বেচাকেনা হয় ঈদুল ফিতরের সময়।
ঈদের আগে পুড়ে যাওয়া বঙ্গবাজারের ব্যবসায়ীরা যেন সাময়িকভাবে ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারেন, সে জন্য ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে বঙ্গবাজার পরিদর্শনের পর সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।