Sun. Jan 24th, 2021
সর্বকনিষ্ঠ নারী প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে যেভাবে চলছে ফিনল্যান্ড

ফিনল্যান্ডে সর্বকনিষ্ঠ এক নারী প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকার গঠনের এক বছর পার হতে যাচ্ছে। তার জোট সরকারে যে পাঁচটি দল আছে তার সবগুলোর প্রধানও নারী।

করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবেলায় তাদের শান্ত ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব সেদেশে প্রশংসিত হচ্ছে। একই সঙ্গে এই সরকার লিঙ্গ সমতার ব্যাপারে উচ্চাকাঙ্ক্ষী একটি কর্মসূচিও গ্রহণ করেছে যাতে বলা হয়েছে যে প্রত্যেক নাগরিকেরই তাদের নিজেদের লিঙ্গ পরিচয় নির্ধারণের অধিকার রয়েছে।

ফিনিশ প্রধানমন্ত্রী সান্না মারিনের অফিস থেকে হাউজ অফ এস্টেটের দূরত্ব দুশো মিটারের মতো যেখানে তিনি তার সরকারের গৃহীত এক প্রোগ্রামের এক বৈঠকে সভাপতিত্ব করতে যাচ্ছেন। ইকুয়ালিটি প্রোগ্রাম নামের এই কর্মসূচি তার সরকারের একটি প্রধান কর্মসূচি।

ছোটখাটো বিষয়ে কথা বলার মতো মুডে তিনি নেই। কিন্তু হানিমুনের পর তার মতো আর কে এরকম কাজ করতে আসবে? এই আগাস্ট মাসে করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে হঠাৎ করে সন্তানের পিতার সঙ্গে সান্না মারিনের বিয়ে হয়েছে। এরপর তারা অজ্ঞাত একটি স্থানে কিছুদিন ছুটিও কাটিয়েছেন।

এর মধ্যে সান্না মারিনের ব্যক্তিগত ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে তার একটি ছবি পোস্ট করা হয়েছে যাতে তিনি ঐতিহ্যবাহী ফ্যাশনের লম্বা-হাতার বিয়ের রেশমি পোশাক পরে তার স্বামী, সাবেক পেশাদার ফুটবলার এবং তার ১৬ বছরের সঙ্গী মার্কুস রাইক্কোনেনকে জড়িয়ে ধরেছেন। এর আগে তিনি তার কন্যা এম্মাকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন এমন একটি ছবিও সোশাল মিডিয়াতে শেয়ার করেছিলেন।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে এই দম্পতির মুখে প্রশস্ত হাসি। তারা একে অপরকে দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরেছেন। তাদের পেছনে রাজধানী হেলসিঙ্কিতে প্রধানমন্ত্রীর অপূর্ব সুন্দর সরকারি বাসভবন কেসারান্তা। বাল্টিক সাগরের তীরে কাঠের অলঙ্কার করা এই ভিলাতেই তারা থাকেন।

রাজনৈতিক সম্পাদক থেকে শুরু করে ফ্যাশন ব্লগার, পডকাস্টার এবং স্কুলের শিক্ষার্থীরাও খুব দ্রুত সান্না মারিনের এই ছবিটি শেয়ার করে। হাউজ অফ এস্টেট, যেখানে জোট সরকারের নেতারা রুদ্ধদ্বার কক্ষে বৈঠক করবেন, তার সামনে বহু সাংবাদিক অপেক্ষা করছেন।

প্রধানমন্ত্রী সান্না মারিন বলেন, ‘আমি তাদেরকে (সাংবাদিকদের) কী বলবো সে বিষয়ে আমি কোন প্রস্তুতি নেই না’। এসময় একজন নারী দেহরক্ষী তার পেছনে হেঁটে যাচ্ছিলেন। ‘তারা আমাকে যেকোন কিছু জিজ্ঞেস করবে এবং আমি সততার সঙ্গে সেগুলোর উত্তর দেব।’

এ সপ্তাহে হয়তো তার ব্যক্তিগত কিছু বিষয়েও তাকে প্রশ্ন করা হতে পারে? ‘না। তারা বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চায়। এখানে তো অনেক কিছুই হচ্ছে,’ জবাব দিলেন সান্না মারিন, ‘হয়তো তারা শেষের দিকে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারে’।

কোন কোন সাংবাদিক মুখে মাস্ক পরে আছেন। কারো কারো হাতে লম্বা লাঠির মাথায় মাইক বাঁধা। বৈঠকে যোগ দিতে রাজনীতিবিদদের মধ্যে সবার আগে এলেন সান্না মারিন এবং তিনি ঠিকই বলেছিলেন- ফিনিশ সাংবাদিকরা বিভিন্ন বিষয়ে তার কাছ থেকে জানতে চাইলেন। এরপর চার ঘণ্টা ধরে বৈঠক হল। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার জন্য তিনি আবার বাইরে বের হয়ে এলেন।

রাজনীতিবিদদের মধ্যে তিনিই সবার শেষে বৈঠক ছেড়ে গেলেন। সান্না মারিনের প্রথম যে ছবিটি ভাইরাল হয়েছিল সেটি তোলা হয়েছিল ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার নতুন চাকরিতে যোগ দেওয়ার প্রথম দিনে। ফিনল্যান্ডের নতুন ও সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী সান্না মারিন, সেসময় তার বয়স ছিল ৩৪ বছর, হাসি মুখে অন্যান্য রাজনীতিবিদদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এই রাজনীতিবিদরাই তার মধ্য-বাম জোট সরকারের নেতৃত্ব দেবেন। তাদের সবাই নারী। এই ছবিটি যখন ছাড়া হয়েছিল, সেসময় পাঁচ-দলীয় জোট সরকারের মাত্র একজন নেতার বয়স ছিল ৩৪ বছরের উপরে।

মন্ত্রী পরিষদের সদস্যদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে সান্না মারিন সেদিন ফটো-সাংবাদিকদের বলেছিলেন যে তিনি ফিনল্যান্ডের তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করছেন। এসময় তিনি আন্তর্জাতিক মিডিয়ারও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা ফিন্সরা কেমন সারা বিশ্বের সামনে তা তুলে ধরার এটাই সুযোগ।’

এই বার্তাটি সেসময় সনাতন রাজনীতির বাইরে ছড়িয়ে পড়েছিল। রেজ এগেইন্সট দ্য মেশিন ব্যান্ডের গিটারিস্ট টম মোরেলো তার ইনস্টাগ্রাম পেজে নতুন জোট সরকারের নেতাদের একটি ছবি পোস্ট করেছিলেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল যে প্রধানমন্ত্রী সান্না মারিন এই আমেরিকান রক ব্যান্ডের একজন ভক্ত। এই পোস্টে লাইকও দিয়েছিলেন সান্না মারিন।

নানা দিক থেকেই ফিনল্যান্ড এধরনের কোয়ালিশনের জন্য প্রস্তুত ছিল। নারীবাদের বিবেচনায় কোনো দেশকে যদি ‘ওয়ান্ডারওম্যান আইল্যান্ড’ বলা হয় তাহলে সেটি হবে এই ফিনল্যান্ড।

বিশ্বে ফিনল্যান্ডই প্রথম দেশ যেখানে ১৯০৬ সালে নারীদের ভোট ও সংসদীয় নির্বাচন- এই দুটো অধিকারই দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমের বেশিরভাগ দেশই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত এতোটা অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। এরপরের বছর ১৯ জন নারী পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০০ সালে ফিনল্যান্ডে প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তারিয়া হালোনেন। এর পর ২০০৩ সালে আন্নেলি ইয়াত্তেনমেকি নির্বাচিত হন প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।

এর পর ২০১৯ সালের শেষের দিকে আরো একজন নারী প্রধানমন্ত্রী হলেন সান্না মারিন। তার মধ্য-বামপন্থী দল সোশাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি তাকে দলের নেতা হিসেবে নির্বাচিত করলে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে ডাক-ধর্মঘট সামাল দিতে গিয়ে সমালোচনার মুখে পড়লে প্রধানমন্ত্রী আন্তি রিন্নে পদত্যাগ করলে সান্না মারিন নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।

তার দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় তিন মাস পর ১১ই মার্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কোভিড-১৯ এর প্রকোপকে মহামারি হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু ভাইরাসটি যখন ফিনল্যান্ডে গিয়ে পৌঁছাল তখন তার জন্য প্রস্তুত ছিল সান্না মারিনের সরকার। ১৬ই মার্চের মধ্যে দেশটিতে লকডাউন জারি করা হল। একই সঙ্গে করা হল জরুরি ক্ষমতা আইন বা ইমার্জেন্সি পাওয়ার্স অ্যাক্ট। এই আইনটি সবশেষ প্রয়োগ করা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। এই আইনে লোকজনের মজুরি নিয়ন্ত্রণ এবং শ্রমের জন্য লোকবল নিয়োগে সরকারকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়।

সরকারের এই উদ্যোগ সংবাদ মাধ্যমে সমালোচিত হলেও জনমত জরিপে দেখা গেছে যে এর পেছনে লোকজনের সমর্থন রয়েছে।

এসময় ফিনল্যান্ডের জনগণকে পরিষ্কারভাবে একটি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল: যতোটা সম্ভব ঘরে থাকুন। যাদের শরীরে মৃদু উপসর্গ দেখা দিবে পরীক্ষা করানোর জন্য তাদেরকে উৎসাহিত করা হল। সমন্বিত পরিকল্পনা অনুসারে কাজ করার জন্য ল্যাবরেটরি, ডাক্তার এবং ক্লিনিকগুলোর মধ্যে অনলাইনে নিয়মিত বৈঠকের ব্যবস্থা করা হল।

প্রধানমন্ত্রী সান্না মারিন এবং জোট সরকারের নেতৃস্থানীয় তার চারজন সহযোগী প্রতি সপ্তাহে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি তুলে ধরতে শুরু করলেন। এসময় তারা সাংবাদিক ও দেশের সাধারণ নাগরিকদেরও প্রশ্নের উত্তর দিতেন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন যিনি শিশুদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিতেন।

এসব কারণে সান্না মারিন ব্যাপক প্রশংসিত হলেন এবং তার নাম তাইওয়ান, জার্মানি ও নিউজিল্যান্ডের সরকার প্রধানের কাতারে স্থান পেলেন। অনেকেই বলতে লাগলেন- তাহলে কি নারী নেতারাই সঙ্কট ভালভাবে সামাল দিতে পারেন!

এই প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন সান্না মারিন নিজেই: ‘পুরুষরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন এমন দেশও তো আছে যারা ভাল করেছে। সুতরাং আমি মনে করি না যে এখানে নারী পুরুষের কোন ব্যাপার আছে। আমার মনে হয় যেসব দেশ ভাল করেছে তাদের কাছ থেকে আমরা কী শিক্ষা নিতে পারি সেদিকেই আমাদের মনোযোগ দেওয়া উচিত।’

ফিনল্যান্ডের জনসংখ্যা ৫৫ লাখ। এপর্যন্ত করোনাভাইরাসে মৃত্যু ৩৭০ জনের কিছু বেশি। প্রতি দশ লাখ মানুষে এই মৃত্যুর হার ৬০। ব্রিটেনে এই মৃত্যুর হার ফিনল্যান্ডের তুলনায় ১০ গুণ বেশি।

সান্না মারিন বলেন, ‘ফিনল্যান্ডে আমরা যে অল্প কিছু বিষয় শিখেছি তার মধ্যে রয়েছে- বিজ্ঞানীদের কথা শোনা খুব গুরুত্বপূর্ণ, আমরা যাতে সব ধরনের জ্ঞান ব্যবহার করতে পারি, যখন অনিশ্চয়তা দেখা দিবে তখন দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমাদের এমন এক সমাজ যা আস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত। জনগণ সরকারকে বিশ্বাস করে, গণতান্ত্রিক আদেশের প্রতিও তাদের আস্থা রয়েছে।’

By HerNet

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *