Fri. Jan 22nd, 2021
আজিজা আজিজ খান, পরিচালক, সামিট গ্রুপ

হারনেট টিভি-সাক্ষাৎকার: আজিজা আজিজ খান, পরিচালক, সামিট গ্রুপ

বিশ্বে লিঙ্গ বৈষম্য হ্রাসে এশিয়ার শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। নারী ক্ষমতায়নের রূপকার হিসাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ বিশ্বব্যাপী সম্মানিত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অবদান ও নারী কল্লানে দৃষ্টান্তগুলোকে মাথায় নিয়ে হারনেট নিউজ “WOMEN LEADS, Inspiration HPM” নামক কলামের মাধ্যমে এমন সব নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে চায় যারা এই অভূতপূর্ব ক্ষমতায়ন এবং অগ্রগতিতে বলিষ্ট ভূমিকা পালন করে চলছে । তার ধারাবাহিকতায় HerNet News এর ” পাতায় এবারের আলোচনাপর্বে অতিথি হিসেবে যুক্ত হয়েছিলেন আজিজা খান পরিচালক, সামিট গ্রুপ |

Azeeza Khan with her family members

করোনাকে মাথায় রেখে দিনকাল কেমন যাচ্ছে ?

মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে আমার স্বামী এবং ছেলের সাথে সিঙ্গাপুরে আসি। তখন গোটা পৃথিবীতে মহামারী পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠে এবং ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যায় বলে আমরা আমার বাবা মায়ের সাথে সিঙ্গাপুরেই আছি প্রথমদিকে চলমান মহামারির জন্য আমার চরম উদ্বিগ্ন সময় কেটেছে আর দেশে নিজের ঘরে চলে যেতে ইচ্ছা করত তবে এটিও সত্য, মানুষ হিসেবে আমরা হাজারো সমস্যার সত্ত্বেও সুখের সন্ধানে লড়ে যাই। সেভাবেই আমি আমার মনকে মানিয়ে নিয়েছি আর পরিবারকে সময় দিচ্ছি। অফিসের কাজ চালিয়ে নেবার জন্য অনলাইনে কাজ করছি এবং জুম মিটি এর মাধ্যমে সহকর্মীদের সাথে যোগাযোগ রাখছি।

একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে আপনি কোন কোন সংস্থার সাথে জড়িত আছেন এবং পারিবারিক দৃষ্টিকোন থেকে কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করুন ?

বর্তমানে আমি সামিটের একজন নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। যেহেতু এটি পারিবারিক ব্যবসা, তাই আমার পারিবারিক জীবন এবং কর্মজীবন ভাগাভাগি করা অসম্ভব । ওয়ার্ক লাইফ ব্যালেন্স করাটা বেশ কঠিন কারন রাতে ডিনার টেবিলের আলাপ ঘুরে ফিরে প্রায়ই ব্যবসা সম্পর্কিত হয়ে যায়। কোন সাপ্তাহিক ছুটির দিন নেই বললেই চলে কারণ প্রতি দিনই কাজের দিন। অন্যদিকে এটি সাফল্যের একটি সুযোগও তৈরী করেছে কারণ বাচ্চাকে দেখাশুনা করতে আমার স্বামী বা বাবা-মা দিনে সময় দিতে পারেন। অপরদিকে পারিবারিক নেতৃত্বাধীন কোম্পানিতে কাজ করার সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, এটি আমাকে সুদূরপ্রসারী চিন্তা করতে সাহায্য করে। শেষ পর্যন্ত, আমরা আমাদের সংস্থাকে একটি টেকসই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তুলতে চাই যা পরিবার এবং সমাজের উপকার করে। এই দীর্ঘস্থায়ী ভাবনার ক্ষেত্রে নারীদের জন্য নেতৃত্বের অবস্থান থেকে কাজে অবদান রাখবার একটি অপূর্ব সুযোগ।

Azeeza Khan with her family and business associate of Summit Group conglomerate

একজন নারী হিসেবে কি ধরণের ছোট বা বড় বৈষ্যমের শিকার হয়েছেন ?

নারীদের প্রতি বৈষম্য তাদের জন্মের পর থেকে শুরু হয়। যেমন কোন কাছের আত্মীয় বললো “তিন নাম্বারটাও মেয়ে হলো” কিংবা  পরিবারের সদস্যরা কৌতুক করলো যে এক বাড়ীতে তিন (৩)  মেয়ে আর্থিকভাবে সাবলম্বী কি আর হতে পারে, বিশেষ করে যেসব পরিবারে ভাই নেই। মেয়েরা হয়তো বাবা অথবা স্বামীর দায়ভার শুধু বাড়াবে। একজন তরুণী হিসেবে কেবল বিয়ের জন্য নিজের সৌন্দর্য তৈরি করে তোলার ব্যাপারে আলাপও আমার শুনতে হয়েছে। আবার অনেকের কাছে শুনেছি যে মা হবার পর বলে মেয়েরা ভালো কাজ করতে পারে না আমি তিন বোনের একটি পরিবারে সবচেয়ে ছোট বোন হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছি তাই আমি ব্যক্তিগতভাবে এসবই শুনেছি। তবে আমি নিশ্চিত যে এসব কথা আমার মতো অনেকেই শুনেছে কারন এ হলো আমাদের সামাজিক রীতির অংশ। আমি আরও বিশ্বাস করি যে  এইসব অভিজ্ঞতাই আমাকে আরও অদম্য করে তুলেছে এবং বিশেষ করে আমার মধ্যে নারীর সংহতির উপর আস্থা তৈরি করেছে।

/বি. নারী ক্ষমতায়নে পুরুষ কী কী ভূমিকা নিতে পারে?

নারী-পুরুষ সমতা অর্জনে এবং নারী ক্ষমতায়নের উদ্যোগে পুরুষদের খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আমার দু’জন সর্বশ্রেষ্ঠ সহযোগী হলেন আমার স্বামী এবং আমার বাবা। আমার স্বামী সবসময় পারিবারিক কাজে অংশগ্রহণ করেন । এটা না হলে হয়তো আমার অনেক সুযোগে অংশ নিতে সম্ভব হতো না। আমার বাবা বাড়িতে এবং অফিসে কাজ করার সমান পরিবেশ তৈরী করে দেয়ার পিছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আমরা মেয়ে বলে কিছু করতে পারবো না, এই রকম কোন আলাপই আমাদের পরিবারে হয়নি। সব সময়ই বলা হয়েছে যোগ্যতা আর পরিশ্রম দিয়ে সব অর্জন করা সম্ভব। তারপরেও যখন আমরা কোন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি তখন আমাদের বাবা আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটের সংবেদনশীলতাগুলি মাথায় রেখে আমাদের পরামর্শ দিয়েছেন। 

Azeeza Khan with her extended family members (also business associate of Summit Group conglomerate)

. আপনার ক্যারিয়ারে অনেক অর্জন উল্লেখযোগ্য কিছু কৃতিত্বের কথা হারনেট এর সাথে শেয়ার করুন?

আমি ২০১১ সালে সামিটে যোগ দেই। আমার ক্যারিয়ার জুড়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি ছিলো বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করা । সহকর্মীদের আস্থাই হলো  আমার সবচেয়ে বড় অর্জন। যেমন কোম্পানীর জন্য ক্রয় এবং ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট, বিভিন্ন অডিট কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং সামিটের  বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিচালক হিসেবে সঠিক সিদ্ধান্ত দেওয়া, যাতে সামিট  অর্থনৈতিক ও পরিবেশবান্ধবভাবে আরও টেকসই উন্নয়ন করতে পারে আর আমাদের সিএসআর এর মাধ্যমে মানুষের কল্যাণ করতে পারি।

. জানতে চাই আপনার শিক্ষাজীবন এবং যে যে পারিবারিক মূল্যবোধ নিয়ে বড় হয়েছেন?

আমি ঢাকায় জন্মেছি। আমি আমার বাবা-মা এবং দুই বড় বোনদের সাথে এখানেই বেড়ে উঠেছি। আমি আমার ও-লেভেল পর্যন্ত গ্রিন হেরাল্ড  ইন্ট্রা: স্কুলে পড়েছি এবং স্কলাস্টিকা স্কুলে এ-লেভেল শেষ করেছি। দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনায় আমি তেমন ভাল ছিলাম না । আমার বাড়ন্ত বয়সে সবসময় আমাকে শিখানো হয়েছে যে ব্যর্থতা আমাকে সফলতার চেয়ে অনেক বেশি ভাল শিক্ষা দেবে। আমার বিশ্বাস, এই শিক্ষাই আমাকে পরবর্তী সময়ে পড়াশুনায় ভাল ফলাফল করতে সাহায্য করেছে। আমি ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করি এবং পরবর্তীতে আমি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের যোগ্যতা অর্জন করি।

Azeeza Khan leading Sied Founding , a facility for the disable children and women

. একজন পেশাদার/ব্যবসায়ী হিসেবে আপনার নেতৃত্বের ধরণ কি?

আমি  অত্যন্ত দক্ষ এবং অভিজ্ঞ সহকর্মীদের সাথে অফিসে কাজ করি। তাই আমি  তাদের অভিজ্ঞতার উপর আস্থা রেখে তাদের সুযোগ দিয়ে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনে কাজ করি। তাদের কাছে থেকে আমি অনেক কিছু শিখতে পারি, আমার সক্ষমতা বাড়াতে পারি। সবচেয়ে বেশী আমি অনুধাবন করেছি যে সবকিছুর সাথে তাল মিলিয়ে এবং সহকর্মীদের দক্ষতা অনুযায়ী লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ।

. শত কাজের ব্যস্ততায় নিজেকে কীভাবে রিল্যাক্স রাখেন

যখন আমি বিশেষ ধকলে থাকি তখন আমি একটি চা/কফির বিরতি নেই বা চাচাতো ভাই-বোন কিংবা সহকর্মীদের সাথে আলাপ করি। আর যখন আমি কাজ না করি তখন আমি বেশির ভাগ সময় বাড়িতেই পরিবারকে সময় দিতে  পছন্দ করি । মহামারীর আগে আমি আমার ছেলেকে নিয়ে পার্কে বা ক্লেস্টস্টেশনে খেলতে নিয়ে যেতাম। আর যখন একা ঘুরবার সময় পাই তখন কেনা-কাটা করতে,পার্লারে যেতে না হলে বাড়ি গোছাতে ভালোবাসি।

. হারনেটের সাথে সংযোগ হওয়ার পিছনের গল্প ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি?

আলিশার সাথে পরিচয় আমাদের কমন বান্ধবীর মাধ্যমে। এরপর হ্যান্ডব্যাগ সম্পর্কে সে আমার সাক্ষাত্কার লাইফস্টাইল ইন্টারভিউয় নিয়েছিল।পরবর্তীতে আমরা দু’জন সামিট-এর স্পন্সর করা একটি প্রোগ্রামে সহযোগিতা করেছি। এই প্রোগ্রামটি সিড ট্রাস্ট নামে একটি সংস্থাকে সমর্থন করার জন্য পরিচালিত হয়েছিল যার লক্ষ্য অটিস্টিক এবং প্রতিবন্ধী শিশুদের সহায়তা করা

. (বিকল্প). যদি কখনো হারনেট এর সাথে সম্মিলিতভাবে কাজ করার সুযোগ আসে নারী কল্যাণে কোন বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে চাইবেন?

নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তার জন্য বিশেষত আমি সৃজনশীল এবং নান্দনিক খাতে যেমন ফ্যাশন ডিজাইনার এবং স্টাইলিস্টদের নিয়ে হারনেট-এর সাথে কাজ করতে চাই। বাংলাদেশের নারীরা তাদের উদ্ভাবন আর মূল্য সৃষ্টির সক্ষমতা দিয়ে নিজেদের প্রতিভাবান উদ্যেক্তা হিসেবে প্রমাণ করছে যা আমাকে অনুপ্রেরণা যোগায়। তা সত্ত্বেও ব্যবসাখাতে নারী উদ্যোক্তারা মাত্র ৪.৪ শতাংশ। আমি বিশ্বাস করি যে নারীদের অর্থনৈতিকখাতে অংশগ্রহণ, সম্পদের ও উৎপাদনের মালিকানা

০৯. নারী ক্ষমতায়নে হারনেট একটি বিপ্লবী উদ্যোগ, এই টিভি থেকে আপনার প্রত্যাশা কি?

আমার প্রত্যাশা থাকবে হারনেট টিভি বাংলাদেশের নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ভূমিকা পালন করবে।

Azeeza Khan with the chairperson, Founder & DMD of HerNet Hosna Prodhan, Alisha Pradhan, Faiza Prodhan & HerNet TV’s advisor Mahjabin Ahmad Mimi.

১০. নারী কল্যাণে এশিয়ার প্রথম টিভি হারনেট এর প্রতিষ্ঠাতা আলিশা প্রধান সম্পর্কে আপনার অভিমত উপদেশ?

আমি আলিশা প্রধান-কে  তাঁর এই মহৎ উদ্যেগের জন্য শ্রদ্ধা করি। এই প্ল্যাটফর্মে কাজ করতে তাঁর যদি কোনরকম বাধার সম্মুখীন হতে হয় সে যেন তাঁর লক্ষ্যের পথে পিছপা না হয়ে এগিয়ে চলে। 

কুইক নোট সেগমেন্ট

 . আপনার স্ট্রেন্থ এবং উইকনেস কি কি?

স্ট্রেন্থ: সহনশীল এবং উদ্যোমী    উইকনেস: সময় ব্যবস্থাপনা।

. কখন খুব রাগ হয় এবং কোন বিষয়টি বেশী আবেগী করে তোলে?

ভণ্ডামি, ব্যর্থতা স্বীকারের অক্ষমতা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অযথা ট্রলিং আর           

 পশু উদ্ধারের ভিডিও আমাকে আবেগী করে তোলে ।

. প্রিয় মোবাইল অ্যাপ কোনটি এবং নেটফ্লিক্স বা টিভিতে প্রিয় অনুষ্ঠান কি?

আমি কোরিয়ান ড্রামার ভক্ত। ‘সামথিং ইন দ্য রেইন’ আমার সবসময়ের প্রিয় নাটক।

৪. চারিত্রিক কোন বৈশিষ্ট্যগুলো পছন্দ  এবং অপছন্দ করেন?

সহিষ্ণুতা এবং উৎফুল্লতা।

. ২৮শে সেপ্টেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন, তাঁর নেতৃত্বকে  কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনেক দূরদর্শী এবং দেশের উন্নয়নের জন্য উচ্চাকাঙ্খী। কোভিড মোকাবিলায় যেসকল নেতৃত্ব প্রশংসিত হয়েছেন তিনি তাদের মধ্যে একজন। তিনি রোহিঙ্গা সমস্যা নিরসনকল্পে অত্যন্ত মানবিক এবং সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমি বিশ্বাস করি তাঁর এই পদক্ষেপ একদিন ঐতিহাসিক বলে বিবেচিত হবে।

By HerNet

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *