Sat. Jan 16th, 2021

ঢাকার আশুলিয়ায় কান্তা বিউটি পার্লারের মালিক মার্জিয়া কান্তাকে (২৬) কুয়াকাটার একটি আবাসিক হোটেল কক্ষে গলা টিপে হত্যার প্রায় দুই বছর পর তদন্তে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। স্বামী ও তার এক সহযোগী কান্তাকে নিয়ে ওই হোটেলে পর্যটক হিসেবে ওঠার পর তাকে হত্যা করে পলিথিনে লাশ মুড়িয়ে খাটের নিচে রেখে  পালিয়ে যান। এরপর হোটেল কর্তৃপক্ষের নজরে এলে তারা ঝামেলা এড়াতে রাতের অন্ধকারে কান্তার লাশ বস্তায় ভরে মোটরসাইকেলের পেছনে তুলে নিয়ে সাগরে ভাসিয়ে দেয়।

আবাসিক হোটেল কর্তৃপক্ষের ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা এবং খুনিরা এতদিন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকার পর সম্প্রতি এই অপরাধের বিস্তারিত বেরিয়ে এসেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তে। গতকাল শনিবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানায় পিবিআই।  

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নরসিংদী জেলা পিবিআই-এর পরিদর্শক মো. মনিরুজ্জামান জানান, নরসিংদী জেলার বেলাবো থানার সোহরাব হোসেন রতনের মেয়ে মার্জিয়া আক্তার কান্তা ঢাকার আশুলিয়ায় বিউটি পার্লারের ব্যবসা করতেন। সেখানে কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারীর শহিদুল ইসলাম সাগরের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র ধরে তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের কিছু দিন পর মার্জিয়া কান্তা জানতে পারেন তার স্বামী শহিদুল ইসলাম সাগরের আরও এক স্ত্রী রয়েছে। বিষয়টি গোপন করে তাকে বিয়ে করায় সহজে মেনে নিতে পারছিলেন না কান্তা। এ নিয়ে তার ব্যক্তিগত ফেসবুক স্ট্যাটাসে স্বামী শহিদুল ইসলাম সাগরকে প্রতারক লম্পট হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।

পরে ভারতে বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে কান্তার মন জয় করেন স্বামী সাগর। পরে ২০১৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর আশুলিয়া থেকে স্বামী-স্ত্রী প্রথমে শরীয়তপুরে আবাসিক হোটেল নূর ইন্টারন্যাশনালে গিয়ে রাত কাটায়। সেখানে শহিদুলের মামাত ভাই মামুন গিয়ে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়। পরদিন তারা শরীয়তপুর থেকে কুয়াকাটায় গিয়ে আবাসিক হোটেল আল-মদিনার একটি কক্ষে ওঠেন। ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ বিকেলে ওই হোটেল কক্ষে তালা ঝুলতে দেখে কোনো সাড়াশব্দ না পাওয়ায় হোটেল কর্তৃপক্ষের সন্দেহ হলে পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ গিয়ে কান্তার ব্যবহৃত জামাকাপড় জব্দ করে নিয়ে গেলেও খাটের নিচে লাশ থাকার বিষয়টি তাদের নজরে আসেনি।

এর দুদিন পর ওই কক্ষ থেকে দুর্গন্ধ বের গতে থাকলে হোটেল ম্যানেজার আমির এবং হোটেল বয় সাইফুলের নজরে আসে। তারা হোটেল মালিক দেলোয়ারকে জানায়। এরপর দেলোয়ার, তার ছোটভাই আনোয়ার, ম্যানেজার আমির ও বয় সাইফুল চারজন মিলে লাশ গুমের সিদ্ধান্ত নেয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী রাত এগারটার দিকে বস্তায় ভরে মোটরসাইকেলের পেছনে তুলে দেলোয়ার ও আনোয়ার কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের পশ্চিম দিকে লেম্বুচর এলাকায় নিয়ে যায়। সেখানে গলা সমান সাগরের পানিতে নেমে লাশ ভাসিয়ে দিয়ে দুইভাই হোটেলে ফিরে যায়।

এ ঘটনার প্রায় এক বছর পর গত বছরের ৩১ জানুয়ারি মার্জিয়া কান্তার বাবা সোহরাব হোসেন রতন বাদী হয়ে হত্যা করে লাশ গুমের মামলা দায়ের করে। নরসিংদী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আদালতে করা ওই মামলায় কান্তার স্বামী শহিদুল ইসলাম সাগরসহ তার পরিবারের পাঁচজনের নাম উল্লেখ করা হয়।

পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে পিবিআই মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব গ্রহণ করে। পরে পিবিআই শহিদুল ইসলাম সাগরকে গ্রেপ্তার করে। চলতি বছর ১ সেপ্টেম্বর তার মামাত ভাই মামুনকেও কৌশলে গ্রেপ্তার পিবিআই করলে তদন্ত আরও গতি পায়।

মামুনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী তাকে নিয়ে পিবিআই কুয়াকাটার আবাসিক হোটেল আল-মদিনায় গত বহস্পতিবার  অভিযানে যায়। এসময় হোটেল মালিক দোলোয়ার, তার ছোটভাই আনোয়ার, হোটেল ম্যানেজার ও বয় সাইফুল ইসলাম মার্জিয়া কান্তার লাশ গুমের সত্যতা স্বীকার করে। পরে ওই চারজনকে গ্রেপ্তার করে নরসিংদী নিয়ে যায় পিবিআই।

পিবিআই পরিদর্শক মো. মনিরুজ্জামান জানান, গ্রেপ্তারকৃতরা হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের সত্যতা স্বীকার করেছে। তাদেরকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।

By HerNet

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *